সাহিত্য সংস্কৃতি সংবাদ-
জন্মদিনে গ্রন্থোৎসবে কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকার
‘নিজেকে ব্যর্থ লেখক মনে হয়’
শফিক হাসান
‘বরিষ ধরা মাঝে শান্তিরও বারী/ শুষ্ক হৃদয়ও লয়ে আছি দাঁড়ায়ে…’ কিরণ সংস্কৃতি সদনের একদল খুদে শিল্পী যখন কণ্ঠে তুলে নিয়েছিল রবীন্দ্রসংগীতটি, তখন সত্যিকার অর্থেই বাইরে শান্তির বারী ঝরছিল। মেঘ-মন্দ্র আকাশ মঙ্গলবারের দুপুর থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টিরেণু ছড়িয়ে যাচ্ছিল। কখনো বৃষ্টিপাতের গতি একটু বাড়ছিল বা কমছিল। বৃষ্টি-বাদল উপেক্ষা করেই সাহিত্যামোদী অনেকেই ভিড় জমাতে শুরু করেছেন।
বরেণ্য কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকারের ৭৩তম জন্মবর্ষপূর্তির আনন্দ আয়োজন উদযাপন অনুষ্ঠান রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটি অডিটোরিয়ামে। সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অনুপ্রাণন প্রকাশন অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে। তাই ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার বিকালটি ছিল মধুরতম ক্ষণ। শান্তির বারী ছুঁয়ে গিয়েছিল অনুরাগীদের শরীর ও মনে।

মঞ্জু সরকারের জন্মদিন উপলক্ষে অনুপ্রাণন প্রকাশ করেছে তার নতুন উপন্যাস ‘নিয়ন্ত্রক’। চলতি বছরের বইমেলায় অনুপ্রাণন প্রকাশ করে তার গল্পগ্রন্থ ‘শখের বাগানে সাপ। বই দুটোর পাঠোন্মোচনও করা হয়। এছাড়া অনুপ্রাণন থেকে প্রকাশিত মঞ্জু সরকারের অন্যান্য বই প্রদর্শনী ও বিক্রির ব্যবস্থা ছিল অনুষ্ঠানস্থলে। পাঠক-ক্রেতারা আগ্রহের সঙ্গে মঞ্জু সরকারের বই সংগ্রহ করেন।
মঞ্জু সরকারের কর্মবহুল জীবনের বিভিন্ন ধাপে আলোকসম্পাত করে সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করে শোনান কবি সদ্য সমুজ্জ্বল।
স্বাগত বক্তব্যে অনুপ্রাণন প্রকাশন-সম্পাদক আবু মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে বিশেষ অবদান রেখে চলেছেন মঞ্জু সরকার। তার সাহিত্যকর্ম নিয়ে বিস্তারিত জানার সুযোগ হয়েছে আজ। বরেণ্য লেখক ও আলোচকরা সবিস্তারে আলোচনা করবেন। মঞ্জু সরকার গুরুত্বপূর্ণ একজন, লেখক হিসেবে তার অবদান অপরিসীম। তার বই প্রকাশ করতে পেরে অনুপ্রাণন প্রকাশন আনন্দিত ও গর্বিত।’
কিরণ সংস্কৃতি সনদের শিশুরা অনুপ্রাণনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিচর্চার অনুষঙ্গ সংগীত পরিবেশন ও কবিতা আবৃত্তি করে থাকে। কচি-কাঁচা এসব শিশুকে যত বেশি সুযোগ দেওয়া যায়, তাদের বিকাশ ঘটবে বলে মন্তব্য করেন আবু মোহাম্মদ ইউসুফ। তিনি বলেন, ‘আমরা পরিকল্পিতভাবেই বরাবর এই সংগঠনের শিশুদের উৎসাহিত করি।’ এসব তিনি শিল্প-সাহিত্যের ত্রৈমাসিক অনুপ্রাণন ও অনুপ্রাণন অন্তর্জাল প্রকাশ-প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন, ‘মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার প্রচেষ্টা হিসেবে আমরা ধারাবাহিকভাবে এসব করে যাচ্ছি। অনুপ্রাণন শুরু থেকেই তরুণ লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে। যারা শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলা এবং নান্দনিক রুচি নির্মানের লক্ষ্যে নিয়ে কাজ করেন, আমরা তাদের পাশে থাকি। এটাই আমাদের ব্রত।’
বর্তমানে ‘বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য, চলচ্চিত্রে যুদ্ধ ও সংঘাত সংখ্যা’ দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশের কাজ চলছে। এর আগে বাংলাদেশের গল্প, বাংলাদেশের কবিতা নিয়ে (চারটি করে) আটটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। এসব সংখ্যায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের সাহিত্যের ভূগোল। অনুপ্রাণন প্রকাশনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য জানিয়ে এই প্রকাশক আরও বলেন, ‘কয়েক বছর যাবত আমরা নিয়মিতভাবে তরুণ লেখক পাণ্ডুলিপি পুরস্কার দিচ্ছি। এর মাধ্যমে প্রতিশ্রুতিশীল ও প্রতিভাবান তরুণ লেখকদের তুলে আনতে চাই। নতুন করে আরেকটা অধ্যায়ও শুরু হলো আমাদের। কথাসাহিত্যিক মঞ্জু সরকারের সাহিত্যকর্ম নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার সূত্রপাত ঘটল। এটা আগামীতেও অব্যাহত রাখার আশা রাখি।’
মঞ্জু সরকারের বই নিয়ে আলোচনা করেন লেখক-গবেষক ও প্রকাশক মফিদুল হক, শিক্ষাবিদ ও লেখক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, প্রাবন্ধিক চৌধুরী মুফাদ আহমদ, কথাসাহিত্যিক নাসিমা আনিস, নাটকার ও চলচ্চিত্রকার গিয়াসউদ্দিন সেলিম।
কথাসাহিত্যিক নাসিমা আনিস বলেন, ‘এটা বিশেষ একটা অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের একজন প্রধান কথাসাহিত্যিককে নিয়ে এমন অনুষ্ঠান সুলক্ষণ হিসেবেই দেখছি। মঞ্জু সরকারের বিভিন্ন লেখায় ধর্মীয় অনুষঙ্গ, পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন দিক উঠে আসে। মঞ্জু সরকার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কথাশিল্পী। তার লেখায় সমাজের গভীর বিশ্লেষণের পাশাপাশি ধর্মীয় অনুভূতি, রাজনীতি, পারিবারিক সম্পর্ক, অবিশ্বাস, সন্দেহ ও ভণ্ডামির চিত্র উঠে এসেছে।’
বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত এই লেখক আরও বলেন, মঞ্জু সরকার না পড়ে থাকলে একজন সাহিত্যের পাঠক সমাজের গভীর বিশ্লেষণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত মনে করব। মঞ্জু সরকারকে পড়া মানে নিজেকেই পড়া। নিজের সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতাকেই নতুন করে পড়া। তিনি অসাধারণ গল্প বলতে পারেন। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে জটিলতা-কুটিলতা-বিষবাষ্প সবই লুকিয়ে আছে মঞ্জু সরকারের গল্প-উপন্যাসে।’
প্রাবন্ধিক সৈয়দ মুফাদ আহমদ তার বক্তব্যে মঞ্জু সরকারের সাহিত্যের বিভিন্ন ইতি ও নেতিবাচক দিক তুলে ধরেন। আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অতিথিদের মঞ্চে না ওঠানোর জন্য প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই। মঞ্চে উঠলে নিজেদের চাঙ্গে তোলার অনুভূতি হয়। এখানে এত বেশি উপহারসামগ্রী পেলাম, মনে হচ্ছে আমরাও সংবর্ধনা পাচ্ছি!’
মঞ্জু সরকারের কথাসাহিত্যে আলোকপাত করে তিনি বলেন, ‘পারিপার্শ্বিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থের দ্বন্দ্ব চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। বড় কোনো নাটকীয়তা নেই। তার গল্প-উপন্যাসে প্রত্যেকটা চরিত্র যেন নিজ নিজ ভাষায় কথা বলে। মঞ্জু সরকারের লেখা পড়লে আমরা সমাজটাকে ভালোভাবে বুঝতে পারব। দেশের অনেক বিখ্যাত লেখকের লেখা পড়েও পরিস্থিতি বোঝা যায় না। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম মঞ্জু সরকার। তিনি যেহেতু সংবাদপত্রে কাজ করেছেন, তাই বোধহয় কিছু লেখা সংবাদমাধ্যমের ভাষ্যের মতো হয়ে গেছে।’
চৌধুরী মুফাদ আহমদ আরও বলেন, “মঞ্জু সরকারের ‘নিয়ন্ত্রক’ উপন্যাসে পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত একজন মানুষের অন্তর্গত মনোজগতের পাশাপাশি সমাজ ও পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে। পারকিনসন্সে আক্রান্ত একজন মানুষের অন্তর্গত স্বগতোক্তিকে কেন্দ্র করে উপন্যাসটিতে চারপাশের সম্পর্ক ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রকাশ পেয়েছে। চরিত্রগুলোর আচরণ তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় উপন্যাসটি সমাজকে দেখার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে ‘শখের বাগানে সাপ’গল্পগ্রন্থে সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার চিত্র স্পষ্ট। তবে উপন্যাসে কিছু জায়গায় অতিরিক্ত তথ্যনির্ভর বর্ণনা এবং যৌনতার ব্যবহারে আরও সংযম হয়ত প্রয়োজন ছিল। গল্পগুলোতে সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার শক্তিশালী উপস্থিতি লক্ষণীয়।” মঞ্জু সরকারের লেখাজোকায় রসবোধেরও প্রশংসা করেন চৌধুরী মুফাদ আহমদ।
নাট্যকর্মী ও চলচ্চিত্রকার গিয়াসউদ্দিন সেলিম বলেন, ‘মঞ্জু সরকার তার কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে দেখেছেন ও দেখিয়েছেন, এভাবে বাংলাদেশের অন্য কোনো লেখক করেছেন বলে মনে হয় না। আমি তার মুগ্ধ পাঠক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তার একটা গল্পকে পথনাটকে রূপ দিয়েছিলাম। পরে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য তার ‘অবগুণ্ঠন’ উপন্যাস অবলম্বনে ধারাবাহিক নাটক বানাই। মঞ্জু সরকার এত সুন্দর করে কীভাবে জীবন দেখে, এত গভীর পর্যবেক্ষণ থাকে সেখানে!’
গিয়াসউদ্দিন সেলিমের মতে, মঞ্জু সরকার বড় মাপের লেখক হলেও অনেকটাই নিভৃতচারী। প্রাপ্য পরিচিতি পাননি। মঞ্জু সরকারের সাহিত্যিক সামর্থ্য অনন্য। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক লেখাগুলোর পাশাপাশি নতুন গল্পগ্রন্থের ‘গৃহপালিত গরুটার গতিপথ’ গল্পটিও মুগ্ধ করেছে বলে জানান এই নাট্যকার।
লেখক ও শিক্ষাবিদ খালিকুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, ‘এই লোকটা এত লিখছেন তবুও নামধাম নেই কেন! মনে হয় সাধারণ লেখক। প্রচুর লেখেন কিন্তু তার লেখার মান পড়ে গেছে এমন কোনো লেখা চোখে পড়েনি কখনো। বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে লেখক হওয়ার জন্য রংপুর থেকে ঢাকায় চলে এসেছেন। সবার সঙ্গে মিশে যাওয়ার যে ক্ষমতা সেটা মঞ্জু সরকারের আছে। তিনি জাত লেখক। তার চরিত্রগুলো বোধহয় অতিকথন করে। দীর্ঘ সংলাপ। এখানে একটু সংযত থাকতে পারলে ভালো হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘লেখক হিসেবে মঞ্জু সরকারের রসবোধ চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। হিউমার না থাকলে লেখাটা ঠিক দাঁড়ায় না। মঞ্জু সরকারের লেখায়-সংলাপে এটা যথেষ্ট পরিমাণে আছে। চরিত্রের মধ্য দিয়ে বাস্তব চিত্র যথাযথভাবে ফুটে ওঠে। মানুষের জটিলতা-কুটিলতা মঞ্জু সরকার গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, সেসব তুলে এনেছেন তার লেখার চরিত্রগুলোর সংলাপে। মঞ্জু সরকার মানুষের আত্মার আত্মীয়। সোলমেট।’
খালিকুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, ‘মঞ্জু সরকার একজন জাত কথাশিল্পী ও শক্তিশালী লেখক। দীর্ঘদিন ধরে লিখলেও প্রাপ্য প্রচার ও স্বীকৃতি পাননি। সমাজ ও মানুষকে দেখার গভীর দৃষ্টি এবং সমকালীন বিষয়কে সাহিত্যে তুলে ধরার ক্ষমতাই তার বড় শক্তি।’ মঞ্জু সরকারের সক্রিয়ভাবে লিখে যাওয়ার প্রশংসা করে তিনি তার কলম শেষ সময় পর্যন্ত সক্রিয় থাকার প্রত্যাশা জানান। তার আলোচনায় আরও উঠে আসে মওলানা ভাসানীকে নিয়ে মঞ্জু সরকারের কাছে একটি বড় উপন্যাসের প্রত্যাশা। তার মতে, সাহিত্যে মওলানা ভাসানী গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল একটি চরিত্র হলেও তাকে ফিকশনে রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে নির্মাণের কাজ এখনো হয়নি। কেউই গল্প-উপন্যাস লেখেননি ভাসানীকে নিয়ে। এই আক্ষেপ প্রকাশ করে খালিকুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, ‘মানুষের সঙ্গে ভাসানীর সম্পর্ক, কনট্রাডিকশন ও মানুষকে প্রভাবিত বা ম্যানিপুলেট করার ক্ষমতা— সব মিলিয়ে তিনি একটি বড় উপন্যাসের উপযুক্ত চরিত্র। প্রবন্ধে কোনো ব্যক্তিকে তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা যায়, কিন্তু রক্ত-মাংসের চরিত্র হিসেবে নির্মাণের কাজ ফিকশন লেখকের।’ মঞ্জু সরকারের কাছে অন্তত একটি প্রতিশ্রুতি চান তিনি— অন্তত এই উপন্যাস শেষ করেই যেন লেখক থামেন।
প্রাবন্ধিক ও গবেষক মফিদুল হক অনুপ্রাণন প্রকাশনের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘একসময় মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা লেখকদের নিয়ে এমন আয়োজন করতেন। এরপর অনুপ্রাণন প্রকাশনকে লেখকদের নিয়ে অনুষ্ঠান করার ভূমিকায় দেখতে পাচ্ছি। অনুপ্রাণনের এমন অনুষ্ঠানের পেছনে ব্যবসা-বুদ্ধি ছিল না, বরং অবুদ্ধি ছিল।’
মঞ্জু সরকারের কথাসাহিত্য সম্বন্ধে তিনি বলেন, ‘মঞ্জু সরকার দুই শ্রেণির মানুষকে নিয়ে লেখেন। উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। রংপুরের মানুষের জীবন, বিশেষ করে গঙ্গাচরার জনজীবন উঠে এসেছে তার লেখায়।’
লেখক জীবনের শুরু থেকেই মঞ্জু সরকারকে কাছ থেকে দেখেছেন মফিদুল হক। লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত না-হওয়া ও প্রকাশিত হওয়া গল্প নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন মফিদুল হক। মঞ্জু সরকারের কয়েকটি গল্প নিয়েও খুঁটিনাটি আলোকপাত করেন তিনি।
মফিদুল হক বলেন, ‘মঞ্জু সরকার একজন অসাধারণ স্টোরিটেলার। তার লেখায় একদিকে প্রান্তিক ও অন্ত্যজ মানুষের জীবন, অন্যদিকে বৃহৎ রাজনৈতিক বাস্তবতা উঠে এসেছে।’ ‘শখের বাগানে সাপ’ গল্পগ্রন্থের ‘গৃহপালিত গরুর গতিপথ’ ও ‘কুড়ানি বুড়ি’ গল্পের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘অতি সামান্য ঘটনা ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে মঞ্জু সরকার মানুষের গভীর জীবনবাস্তবতা, স্বপ্ন, বেদনা ও সমাজের পরিবর্তন তুলে ধরেছেন। অন্যের জীবনের বেদনা ও বাস্তবতা গভীরভাবে উপলব্ধি করার ক্ষমতাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি।’ মঞ্জু সরকারের গল্পের জীবনঘনিষ্ঠতার দিক তুলে ধরেন তিনি। ‘গৃহপালিত গরুটার গতিপথ’ গল্পের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন, ‘প্রান্তিক মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গকে মঞ্জু সরকার অল্প পরিসরে যে গভীরতায় তুলে ধরেছেন, তা বিস্ময়কর। তার গল্প বাংলা সাহিত্যে টিকে থাকবে।’

অনুষ্ঠানের শেষাংশে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে মঞ্জু সরকার বলেন, ‘আঠারো কোটি মানুষের দেশে মরে যাওয়াটা খুব সহজ। মানুষের অধিকার কিংবা মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন। আর লেখক পরিচয়ে বেঁচে থাকা তো আরও কঠিন। মুক্তিযুদ্ধের পর সিদ্ধান্ত নিলাম— অন্য কিছু নয়, লেখক হবো। লেখক হওয়ার স্বপ্ন-সংগ্রাম স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকেই চলছে। আমৃত্যু চলবে।’
নিজের লেখালেখি ও বর্তমানের বইবাজারের নাজুক চিত্র তুলে ধরে মঞ্জু সরকার বলেন, ‘সময় গড়িয়েছে অনেক। কিন্তু লেখকের কর্মপন্থা-চিন্তাপদ্ধতি একই আছে। দোয়াত-কলমের যুগ পেরিয়ে এখন কম্পিউটার যুগ চলছে। নিজের লেখার মান মূল্যায়ন করলে নিজেকে ব্যর্থ লেখক মনে হয়। একটা বই লেখার পর পাঠকরা কীভাবে নিচ্ছে তা জানা যায় না। এখন বই বিক্রি হয় না। অথচ স্বাধীনতার পর একেকটা বই দেড় থেকে দুই হাজার ছাপা হতো। সেটা বর্তমানে দুই-তিনশ কপিতে নেমে এসেছে।’
নিজের লেখালেখির পূর্বাপর চিত্র তুলে ধরে মঞ্জু সরকার বলেন, ‘লেখক হিসেবে কিঞ্চিত সাফল্য পেয়েছি, কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে নিজেকে একজন ব্যর্থ লেখকও মনে হয়। একজন লেখকের সাফল্য নির্ভর করে তার লেখা পাঠকের মনে কতটা স্থায়ী দাগ কাটতে পারে তার ওপর।’
লেখকের জীবনকে পৌরাণিক চরিত্র সিসিফাসের পাথর ঠেলে পাহাড়চূড়ায় তোলার সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘একটা বই ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করতে হবে। এই চেষ্টার মধ্যেই লেখকের আনন্দ, এই চেষ্টাই তার জীবন, এই চেষ্টাই ভালোবাসা।
আমি সামনে আরও ভালো কিছু লেখার চেষ্টা করছি। এমনকি অনুপ্রাণন প্রকাশক আবু মোহাম্মদ ইউসুফকে বলেছি, আমার মাস্টারপিস (মওলানা ভাসানী ওপর উপন্যাস) সামনে আসছে।’
নিজের জন্মদিনকে কেন্দ্র করে এমন আয়োজনের জন্য প্রকাশক আবু মোহাম্মদ ইউসুফসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানান মঞ্জু সরকার। তিনি বলেন, ‘লেখকের সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো তার বই নিয়ে পাঠক ও সমালোচকদের আলোচনা শোনা। সাধারণত বই প্রকাশের পর পাঠকরা কীভাবে তা গ্রহণ করেছেন, একজন লেখকের পক্ষে তা জানা কঠিন। কিন্তু এই আয়োজনে দেশের বিশিষ্ট লেখক-সমালোচকেরা তার বই নিয়ে আলোচনা করেছেন— এটি আমার জন্য বিরল অভিজ্ঞতা।’
স্বাধীনতার পর যে স্বপ্ন নিয়ে লেখালেখি শুরু করেছিলেন, সময়ের সঙ্গে সেই পরিসর সংকুচিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন পাঠকই কমে গেছে, নাকি লেখকের সঙ্গে পাঠকের যোগাযোগ তৈরির সক্ষমতা কমেছে? এমন বিপ্রতীপ বাস্তবতাতেও লেখালেখি থেকে সরে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখেন না মঞ্জু সরকার। চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াকেই লেখকের জীবন ও ভালোবাসা হিসেবে দেখেন তিনি।
অনুষ্ঠানে মঞ্জু সরকারের সাহিত্যকর্মের ওপর মূল্যায়নধর্মী একটা বই প্রকাশের উদ্যোগের কথা জানানো হয়। সম্পাদনা করবেন খালিকুজ্জামান ইলিয়াস। মঞ্জু সরকারকে নিয়ে লিখতে আগ্রহী লেখকদের যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়।

অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে অতিথিদের হাতে উপহার তুলে দেন প্রকাশক আবু মোহাম্মদ ইউসুফ ও কথাসাহিত্যিক মনি হায়দার। শিশুশিল্পীদের হাতে উপহার তুলে দেন কথাসাহিত্যিক সোলায়মান সুমন। প্রকাশককে সঙ্গে নিয়ে মঞ্জু সরকারের ফ্রেমবন্দি পোর্ট্রেট, নগদ অর্থ ও বিভিন্ন উপহারসামগ্রী তার হাতে তুলে দেন আলোচকবৃন্দ। পুরো অনুষ্ঠান মুখর ও প্রাণবন্ত ছিল কথাসাহিত্যিক মনি হায়দারের প্রাণবন্ত উপস্থাপনায়। ছোট ছোট কথামালায়।
বিশেষ অতিথিদের শুভেচ্ছা স্মারক হিসেবে ফুলের তোড়া, অর্কিড ফুল গাছ, মগ ও উত্তরীয় দিয়ে সম্মান জানানো হয়।
ছোটগল্প, উপন্যাস ও শিশু-কিশোর সাহিত্য, আত্মজীবনী, প্রবন্ধ-নিবন্ধসহ মিলিয়ে অর্ধশতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা মঞ্জু সরকার ১৯৯৮ সালে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। এছাড়া ফিলিপস, আলাওল, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল ও অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি পুরস্কারসহ পেয়েছেন বেশকিছু সাহিত্য পুরস্কার ও সম্মাননা। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আবাসিক লেখক কর্মসূচিতেও অংশ নেন তিনি। তার সাহিত্যকর্ম কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমফিল ও পিএইচডি কোর্সে পড়ানো হয়।
মঞ্জু সরকারের জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে, রংপুরে। তার কর্মস্থল ছিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি দুইটি জাতীয় দৈনিকে দশ বছর সাংবাদিকতা করেন। বর্তমানে শুধু লেখালেখি করেই তার দিন কাটছে। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে লিখছেন দীর্ঘ উপন্যাস। লেখক মনে করছেন এটা হবে তার রচিত সেরা বই।
অনুষ্ঠানে আগত সুধীজন ও আলোচকদের প্রায় অভিন্ন মন্তব্য ছিল, লেখক হিসেবে মঞ্জু সরকার এখনো অবহেলিত। তার পাঠকসংখ্যাও যথোপযুক্ত নয়। যতটুকু সম্মান ও স্বীকৃতি তার পাওয়ার কথা ছিল, সেটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হয়নি বললেই চলে। সংস্কৃতি অঙ্গনের এই বন্ধ্যত্ব ও প্রতিকূলতা দূরীভূত করা জরুরি। বলতে গেলে লেখক হওয়ার জন্য এক কাপড়ে এই ঢাকা শহরে চলে এসেছেন তিনি। তারপর কত উত্থান-পতন, ঝড়-ঝাপটার মুখোমুখি হয়েছেন ইয়ত্তা নেই। তবুও স্বীয় লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। লেখক হওয়ার সেই স্বপ্নের পথযাত্রা অদ্যাবধি চলমান। দৃশ্যমান তো বটেই। পরিকল্পনামতো ভালো কিছু লেখা লিখে যেতে যান বলে জানান মঞ্জু সরকার। যে লেখা তাকে টিকিয়ে রাখবে, বাঁচিয়ে রাখবে।












